এইচপিভি টিকা: কাদের নেওয়া উচিত, সঠিক বয়স এবং উপকারিতা

You are currently viewing এইচপিভি টিকা: কাদের নেওয়া উচিত, সঠিক বয়স এবং উপকারিতা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সার্ভিকাল ক্যান্সার বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে চতুর্থ সর্বাধিক প্রচলিত ক্যান্সার এবং এর প্রধান কারণ হলো হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা এইচপিভি। অথচ সুখের বিষয় হলো, এই ভাইরাসটিকে একটি সাধারণ টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। ২০২২ সালে আনুমানিক ৬,৬০,০০০ নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। একই বছরে, জরায়ুমুখের ক্যান্সারের কারণে হওয়া ৩,৫০,০০০ মৃত্যুর প্রায় ৯৪% নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে ঘটেছিল। এই রোগের প্রকোপ এবং মৃত্যুর সর্বোচ্চ হার দেখা যায় সাব-সাহারান আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। এই আঞ্চলিক পার্থক্যগুলি টিকাদান, স্ক্রিনিং এবং চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অসমতাকেই প্রতিফলিত করে। এই ব্লগে আমরা জানবো, এইচপিভি টিকা আসলে কী, কাদের এটি নেওয়া উচিত, সঠিক বয়স কোনটি এবং এর উপকারিতাগুলো কী কী।

কারা এই টিকা নিতে পারবে?

এইচপিভি টিকা ছেলেদের জন্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

  • মেয়েরা: সার্ভিকাল, যোনিমুখ এবং মলদ্বারের ক্যান্সার প্রতিরোধে এই টিকা অত্যন্ত কার্যকর।
  • ছেলেরা: মলদ্বার, গলা এবং যৌনাঙ্গের ক্যান্সার থেকে সুরক্ষা পেতে এবং সঙ্গিনীকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে।
  • প্রাপ্তবয়স্করা: ২৬ বছর পর্যন্ত সবাই এবং ২৭ থেকে ৪৫ বছর বয়সীরাও চিকিৎসকের পরামর্শে নিতে পারেন।
  • কারা নিতে পারবেন না: গর্ভবতী মহিলা, টিকার যেকোনো উপাদানে অ্যালার্জি আছে এমন ব্যক্তি এবং তীব্র অসুস্থতার সময়ে এই টিকা এড়িয়ে চলা উচিত।

টিকা নেওয়ার সঠিক বয়স কখন?

এইচপিভি টিকার সবচেয়ে বেশি কার্যকারিতা পাওয়া যায় যদি ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার আগেই নেওয়া হয়। তাই বিশেষজ্ঞরা নির্দিষ্ট বয়সসীমা সুপারিশ করেন।

  • ৯ থেকে ১৪ বছর: এটি আদর্শ বয়সসীমা। এই বয়সে মাত্র ২টি ডোজে সম্পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া যায় (৬ মাসের ব্যবধানে)।
  • ১৫ থেকে ২৬ বছর: এই বয়সে ৩টি ডোজ দেওয়া হয়।প্রথম ডোজের পর ১ বা ২ মাসে দ্বিতীয় এবং ৬ মাসে তৃতীয় ডোজ।
  • ২৭ থেকে ৪৫ বছর: এই বয়সেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে টিকা নেওয়া সম্ভব, তবে কার্যকারিতা তুলনামূলক কম।

এইচপিভি ভাইরাস কী এবং এটি কীভাবে ছড়ায়?

হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV) হলো একটি অত্যন্ত সাধারণ ভাইরাস, যা মূলত শারীরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে একজন থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এইচপিভির ১০০-এরও বেশি ধরন রয়েছে, এর মধ্যে কিছু ধরন ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। বিশেষত, এইচপিভি টাইপ ১৬ এবং ১৮ সার্ভিকাল ক্যান্সারের প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রের জন্য দায়ী। এছাড়াও এই ভাইরাস মুখ, গলা, মলদ্বার এবং যৌনাঙ্গের ক্যান্সারও ঘটাতে পারে। অনেকের শরীরে এইচপিভি সংক্রমণ হলেও কোনো লক্ষণ দেখা যায় না, যার ফলে অজান্তেই এটি একজন থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

এইচপিভি টিকার উপকারিতা

এইচপিভি টিকা বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত একটি কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এর প্রধান উপকারিতাগুলো হলো:

  • ক্যান্সার প্রতিরোধ: গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক বয়সে নেওয়া হলে এই টিকা সার্ভিকাল ক্যান্সারের ঝুঁকি ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।
  • দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা: টিকা নেওয়ার পরে দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় থাকে।
  • পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা: একজন টিকা নিলে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।
  • জেনিটাল ওয়ার্টস প্রতিরোধ: এইচপিভি টাইপ ৬ ও ১১-এর বিরুদ্ধেও কিছু টিকা কার্যকর, যা যৌনাঙ্গের আঁচিল প্রতিরোধ করে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও প্রচলিত ভুল ধারণা

অনেকে মনে করেন এইচপিভি টিকা নিলে বড় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অত্যন্ত সামান্য। ইনজেকশনের স্থানে সামান্য ব্যথা বা ফোলা, হালকা জ্বর এবং মাথা ঘোরা এগুলো সাধারণত ১ থেকে ২ দিনের মধ্যে কমেও যায়। এই টিকা নেওয়ার পরেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া জরুরি। মনে রাখবেন, টিকা সব ধরনের এইচপিভি থেকে সুরক্ষা দেয় না, তাই নিয়মিত স্ক্রিনিং অপরিহার্য।

একটি প্রচলিত মিথ হলো  ‘টিকা নিলে বিবাহপূর্ব যৌন সম্পর্কে উৎসাহিত করা হয়।’ এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এইচপিভি টিকা একটি ক্যান্সার প্রতিরোধক টিকা, ঠিক যেমন হেপাটাইটিস বি টিকা লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

উপসংহার

এইচপিভি টিকা বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি অসাধারণ উপহার। সঠিক বয়সে এই টিকা নেওয়া মানে নিজেকে এবং আপনার পরিবারকে একটি ভয়াবহ ক্যান্সার থেকে সুরক্ষিত রাখা।

REFERENCE LINKS